Skip to Content

সমসাময়িক

তসলিমা, ফিরে আসুন

সৈকত দে



যদি, কিন্তু ছাড়াই এই রচনার প্রথম বলবার কথাটি হল- তসলিমা নিজের দেশে ফিরে আসুন। পৃথিবীর যে কোনও ভাষার যে কোনও লেখকের নিজের দেশের মাটিতে স্বাধীন ভাবে হাঁটার অধিকার আছে। কেবল লেখক বলছি কেন, যিনি লেখেন না- সাধারণ মানুষ, তিনিও নিজের দেশে নিরাপদে বুক ফুলিয়ে বাঁচবেন। অন্তত এমনটিই দেশ স্বাধীন করবার জন্য জীবন বাজি রাখবার সময় মুক্তিযোদ্ধারা ভেবেছিলেন। বত্রিশ বছরের বেশি সময় তসলিমা নাসরিন জন্মদেশ থেকে নির্বাসিত। ১৯৯৪ সালের ৮ আগস্ট তৎকালীন সরকার তাঁর 'নিরাপত্তার স্বার্থে' দেশ থেকে বের করে দেয়৷ তেরো বছর পর, ২০০৭ সালের ২২ নভেম্বর, বাংলাদেশ থেকে ছিটকে পড়ে যে শহরে তিনি ছিলেন, সেখান থেকেও তাঁকে বেরিয়ে পড়তে হল। তখন 'বামপন্থী' সরকার ক্ষমতায় পশ্চিমবঙ্গে। সাধারণের কাছে তাঁরা মুক্তমতের পৃষ্ঠপোষক বলে মান্য। তবু তসলিমা নাসরিনকে চলে যেতে হল, প্রায় এক কাপড়ে। তাঁর পোষা বেড়ালটিকে তিনি নিয়ে যেতে পারেননি। চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় একটি অপূর্ব চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন- 'নির্বাসিত' নাম চলচ্চিত্রটির। তসলিমার নির্বাসিত জীবনের ছায়ায় ছবিটি নির্মিত। চুরানব্বই সালে তিনি বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হওয়ার সময় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি সরকার। তারপর, বত্রিশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশিবার 'মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের' সরকার ছিল ক্ষমতায়। মাঝখানে স্বল্পকালীন সেনাশাসন, একবার বিএনপি সরকার এবং প্রচুর রক্তপাতের পর এখন আবার বিএনপি সরকার। কোনও সরকারই তাঁকে ফেরানোর উদ্যোগ নেয়নি৷ যদিও সম্প্রতি তাঁর কলকাতা আসাকে কেন্দ্র করে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিনি আবেদন করলে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। মন ভারী হয়ে আসে। একজন নির্বাসিত লেখককে নিজের দেশে ফিরতে আবেদন করতে হবে! জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার একজন নির্বাসিত লেখকের জন্য এইটুকু সাহস দেখাবেন না? আমন্ত্রণ জানাতে পারেন না? তাঁর ফিরে আসাকে কেন্দ্র করে আমরা আনন্দ করতে পারি না?

২.

এখন পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় বিজেপি সরকার। তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় ফেরাকে কেন্দ্র করে সীমান্তের ওপারের গণমাধ্যমে ব্যাপক চাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে। জীবনের একটি নাতিদীর্ঘ সময় সদ্য ক্ষমতাচ্যুত সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সকল অন্যায়কে সমর্থন করায় বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি কবি জয় গোস্বামী তসলিমা নাসরিনের সংবর্ধনাস্থলে বিজেপি সমর্থকদের একাংশের ধিক্কার-ধ্বনির শিকার হয়েছেন৷ তবু অভিমানে, রাগে প্রস্থান না করে শান্ত হয়ে তিনি তসলিমা নাসরিনের সম্পূর্ণ বক্তব্য শোনেন। তসলিমা নাসরিন অসামান্য কিছু কথা বলেছেন - 'কৃতজ্ঞতা আনুগত্যের চুক্তি নয়। কৃতজ্ঞতার বিনিময়ে আমি আমার স্বাধীন চিন্তাকে বন্ধক দিই না। আবার মতভিন্নতাও আমাকে অকৃতজ্ঞ করে না।' যে দেশে তিনি এখন থাকেন, তার নাগরিকত্ব তিনি পেয়েছেন কিন্তু ভারী গলায় জানান - 'কিন্তু নাগরিকত্ব আর আপনত্ব এক জিনিস নয়।' আবেগ আশ্রিত বক্তৃতা তিনি শেষ করেন এইভাবে- 'শেষ পর্যন্ত কোনও মানচিত্র নয়, মানুষের ভালোবাসাই আমার দেশ।' এই বক্তৃতা শোনার পর, তসলিমা কেন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি নিয়ে টুঁ শব্দ করেন না, বাবরি মসজিদ ধ্বংস আর সেই ধ্বংসের সাথে যুক্ত মানুষেরা কোন মন্ত্র বলে নরেন্দ্র মোদীর আমলে বেকসুর মুক্তি পেয়ে যায়- এই বিষয়ে তিনি কোনও মন্তব্য করেন না, এইসব কথা মনে থাকে না৷ তখন মনে হয়, একজন মানুষ তাঁর পরিসর হিসেবে যতদূর নির্বাচন করে নেবেন, ততটুকুর মধ্যেই তিনি থাকুন। তিনি সুনির্বাচিত প্রতিবাদী বা সর্বদর্শী নন, এই তর্ক করতে গিয়ে তাঁর দেশে ফেরার অধিকার ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের অনেকের মনে পড়বে, ১৭ ডিসেম্বর ২০০৩ দেশ পত্রিকার  তসলিমা নাসরিন সংখ্যাটি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয়েছিল। তসলিমা নাসরিন, শিবনারায়ণ রায় এবং মহাশ্বেতা দেবীর রচনার পৃষ্ঠাগুলো ছিঁড়ে ফেলেছিল তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার- তখন ক্ষমতায়, অনেকের মনে থাকবে, বিএনপি সরকার।


কবি জয় গোস্বামী সংবর্ধনাস্থলে ধিক্কার-ধ্বনি কর্তৃক আহত হওয়ার আগে ও পরে একাধিক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। দুই সাক্ষাৎকারের দুই চুম্বক অংশ কেন্দ্র করে দুই কথা বলে এই ছোট গদ্যের ইতি টানব। 'টিভি নাইন' ইউটিউব চ্যানেলের সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন- '... আমি কোনও বাঙালি লেখককে দেখিনি যে জীবন পণ করে নিজের সত্যের সঙ্গে এতখানি প্রত্যক্ষভাবে কৌশল না করে আটকে থাকতে, তাকে তিনি ধরে রেখেছেন...।' ইনস্ক্রিপ্ট ডট কম ইউটিউব চ্যানেলের ১৯ জুলাইয়ের সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ পড়তে পারি- 'আমি আমার অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, আমার এই বাহাত্তর বছরের জীবনে, আমি যতদিন বিভিন্ন সাহিত্যিকদের জীবন পড়ছি, আমি তো বাংলায় এমন কোনও সাহিত্যিককে আমি দেখিনি যার ভেতরে তসলিমার মতন, তসলিমা নাসরিনের মতন মানসিক দৃঢ়তা এবং যে কাজ করেছি সে কাজের জন্য, যৌক্তিকভাবে সে কাজকে সমর্থন করা,... সালমান রুশদী পর্যন্ত ক্ষমা চেয়েছিলেন।' কবি জয় গোস্বামী অন্য কোনও  বাংলা ভাষার লেখককে খণ্ডে খণ্ডে তসলিমা নাসরিনের মতো অকপট, সাহসী আত্মজীবনী লিখতে দেখেননি। এই প্রশ্ন কতদূর সত্য, অন্তত কমপক্ষে গত দুইশ বছরের বাংলা গদ্যকে সামনে রেখে আমরা ভেবে দেখতে পারি। এই চিন্তাচর্চায় তসলিমা ছোট হয়ে যান না, বরং এই অতিশয়োক্তির ব্যাপারে আমরা সতর্ক হতে পারি। একজনকে বড় করতে গিয়ে অন্যদের জীবনব্যাপী চেষ্টা খারিজ করে দেওয়া যুক্তিশীল আচরণ নয়।

তসলিমা নাসরিন ও জয় গোস্বামী প্রায় চল্লিশ বছরের বন্ধু৷ এই দীর্ঘ সময়ে তসলিমা, বন্ধুকে অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের কোনও বই পড়ালেন না কেন ভেবে আশ্চর্য লাগে। জয় নিজে দীর্ঘদিন সংবাদপত্রের অফিসে কাজ করেছেন। তিনি অভিজিৎ রায়কে চেনেন না। মাত্র দুইটি নাম বললাম। এই দুইজন কি কম সাহসী ছিলেন? 'একজনও দেখছি না' উচ্চারণে এক ধরনের স্বনির্বাচিত অন্ধতা আছে, বন্ধুকৃত্য আছে কিন্তু সত্য নেই। সালমান রুশদী কখন কোথায় ক্ষমা চেয়েছিলেন, অনেক অনুসন্ধানেও তথ্যটি পাইনি। তাঁর আক্রান্ত হওয়ার পরের বই 'নাইফ' পড়েও এই ধরনের তথ্য পাইনি।

তসলিমার নিজের দেশে ফিরে আসার ক্ষেত্রে জটিলতা নিরসন, একটি দেশের নাগরিকের মুক্ত মতের যে অধিকার আমাদের সংবিধান দিয়েছে, সে সংবিধানের মর্যাদা সমুন্নত রাখার জন্যেই জরুরি। তসলিমা নাসরিনের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাসনা করি। আমাদের দেশটিকে বিশ্বের কাছে অসাম্প্রদায়িক প্রমাণ করবার এত বড় সুযোগ বার বার আসবে না।

অগস্ট, ২০২৬

(মতামত লেখকের নিজস্ব)


সৈকত দে

প্রিয় লেখক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। পড়েন মূলত কথাসাহিত্য, চলচ্চিত্র সংক্রান্ত ভালো গদ্য। প্রতিদিন চলচ্চিত্র দেখেন। প্রায় প্রতিদিন। ঋত্বিক ঘটক আর থিও অ্যাঞ্জেলোপোলাস তাঁর প্রিয়তম নির্মাতা। স্বপ্ন আর বাস্তবতা মিলে মিশে থাকে তাঁর যাপন৷ প্রাক্তন বন্ধু, প্রেমিকা, সিনেমা দৃশ্য ফিরে ফিরে আসে৷