গল্প
ভাণ
রিনি গঙ্গোপাধ্যায়
শান্তনু পাশ ফিরে শুলো। ওর কপালে চিন্তার ভাঁজ। ভুঁরুটা কুঁচকে আছে। এই নিয়ে তিনদিন হলো। প্রথমদিন শান্তনু ভেবেছিল এ অভিজ্ঞতা তো জীবনে কখনো হয়নি। আনকোড়া একেবারে। বয়সটাও কম। ভয় পেয়ে গেছে নিশ্চয়ই। তবে ভয় পেয়ে যেভাবে রিএক্ট করছিল কান্তা সেটা খুবই অদ্ভুত! ভয় পেতেই পারে, অস্বস্তি হতে পারে, লজ্জা, সংকোচ সবই হতে পারে। কিন্তু ঠকঠক করে কাঁপছে, সিলিং এর দিকে তাকিয়ে হাঁ করে নিঃশব্দে কাঁদছে... এগুলো খুব স্বাভাবিক মনে হয়নি শান্তনুর। শান্তনু তো অপরিচিত কেউ নয় কান্তার কাছে। তাদের মধ্যে যে ঠিক প্রেম হয়েছিল তা নয়; তবে ওদের পরিবারের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর শান্তনুর বাবা-মা এরকম একটা সম্ভাবনার কথা প্রথম বলেছিল, হলে কিন্তু মন্দ হবে না! শান্তনুর বাবা বলেছিল। শান্তনু একবাক্যে বিষয়টা উড়িয়ে দিয়েছিল। কত ছোটো বলো তো! বোনের থেকেও ছোটো। বাচ্চা একটা মেয়ে!
আহা! হয় কী হয় না সে আমরা বুঝব। তুই শুধু বল পছন্দ কি না! শান্তনুর মা বলেছিল।
কী যে বলো না! পছন্দ আবার কী! তাছাড়া একা আমার মতে হবে না কি! ওর একটা মতামতের ব্যাপার নেই!
বোন পাশ থেকে ফুট কেটেছিল, ওর! এখনই ওর! নামটা নিতে লজ্জা করছে না কি রে দাদা!
বোনের মাথায় চাটি মেরে রাগের ভাণ করে নিজের ঘরে ঢুকে পড়েছিল শান্তনু। অন্ধকারে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অবশ্য একা একাই হেসে ফেলেছিল সে! কানটা হঠাৎই গরম হয়ে উঠেছিল।
তারপর তো আর বেশি সময় লাগেনি ব্যপারটা বাস্তবায়িত হতে। কান্তার মা বাবা আপত্তি তো করেইনি, বরং খুশি হয়েছিলেন! এ তো মেঘ না চাইতেই জল! আমি কোথায় ভাবছি মেয়ে বড়ো হয়েছে। এবার পাত্র খোঁজার পালা! কোথায় খুঁজব! কেমন মানুষ হবেন তাঁরা! মেয়েকে কেমন রাখবে! এইসব নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। আপনি তো আমার মুশকিল আসান করে দিলেন মশাই! কান্তার বাবা এসব বলে জড়িয়ে ধরেছিলেন শান্তনুর বাবাকে। ব্যাস! তারপর ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেছিল ওদের। কান্তা শুধু বলেছিল, ও পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করতে চায়। তাতে আপত্তি করেনি শান্তনুর বাবা মা। বিয়ের ঝঞ্ঝাট মিটিয়ে অষ্টমঙ্গলার পরদিনই কান্তাকে নিয়ে আকাশে ভেসে গেছিল শান্তনু! সোজা আন্দামান! নীল দ্বীপের মাঝে কান্তাকে মনের কথাটা ঠিকঠাক করে বলবে ভেবেছিল শান্তনু। তার আগে একবাড়ি লোকের মাঝে মেয়েটাকে বিব্রত করে লাভ নেই। বাচ্চা মেয়ে ঘাবড়ে যেতে পারে! তবে একেবারে দূরে থাকতেও পারেনি শান্তনু। আলতো করে ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়েছিল সে। কান্তা মাথাটা নিচু করে নিয়েছিল। শান্তনুর মনে হয়েছিল এই মেয়েটির প্রথম ছোঁয়ার লাজটুকু তার জন্য রাখা ছিল। আনন্দে শান্তনু জড়িয়ে নিয়েছিল কান্তাকে। কান্তা শান্তনুর বুকের মধ্যে ধরা দিয়েও কেমন যেন কুণ্ঠিত হয়েছিল। সেটাকেও প্রথম স্পর্শের প্রাথমিক দ্বিধা ভেবেই আনন্দ পেয়েছিল শান্তনু।
কিন্তু আজ এই মুহূর্তে শান্তনু আর এটাকে কেবল সংকোচ, লজ্জা বলে ব্যাখ্যা করতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে কিছু একটা সমস্যা আছে! কান্তাকে আদর করতে গেলেই কান্তা এতটা অসহায় হয়ে পড়ে কেন! যেন ওর অনিচ্ছায় জোর করে ওকে... শান্তনু আর ভাবতে পারে না। ওর কেমন নিজেকে রেপিস্ট মনে হচ্ছে। এই তিনদিন কান্তারও মুখভার। তার কারণটাও শান্তনু কিছুতেই অনুধাবন করতে পারছে না। শান্তনু কি কোনো অন্যায় করেছে! কান্তা কি আরো সময় চায়! সময় চাইলে অসুবিধে কিছু নেই! কিন্তু অস্বস্তির প্রতিফলন এমন নিঃশব্দ হাহাকার হবে কেন! কান্তার বয়সটা কম! শান্তনুর থেকে অনেকটাই ছোটো। তবে এতটাও ছোটো নয় যে নর-নারীর স্বাভাবিক শারীরিক সম্পর্কটুকু জানে না! বা বোঝে না! আজকালকার মেয়ে। সায়েন্স নিয়ে পড়ছে। পড়াশোনায় এত ভালো! সে এই ব্যাপারে কিছুই জানে না, বোঝে না - এটা তো হতে পারে না! তাহলে সমস্যাটা কোথায়! ওর কি কোনো খারাপ অভিজ্ঞতা আছে? ছোটোবেলায় কি কিছু ঘটেছিল ওর সঙ্গে! তাই কি ও এভাবে রিএক্ট করছে! শান্তনু ঠিক করল কান্তার সঙ্গে কথা বলবে।
পরদিন ওদের হ্যাভলক যাওয়ার কথা। অপূর্ব সুন্দর একটা জায়গা। নীল সমুদ্র আর নীল আকাশ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ভ্যারিয়েন্ট শেডস অফ ব্লু! পিছনে সবুজের সমারোহ। আর সামনে এই নীল বিস্তার! শান্তনুর মাথা থেকে আগের রাতের দুশ্চিন্তাটা জাস্ট উড়ে গেল। সারাদিন প্রকৃতির ছবি তুলে আর তার শোভা দেখেই কেটে গেল। রাতে ডিনার করে শান্তনু অন্ধকারে সমুদ্রমুখি বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাল একটা। কান্তা রাতের পোশাক পরে ফ্রেশ হয়ে শান্তনুর পাশে এসে দাঁড়াল।টুকটাক কথা বলতে বলতে কান্তা আলতো করে শান্তনুর আঙুলে আঙুল বোলাচ্ছে! ওর মুখে একটা নির্মল আনন্দ যেন খেলে যাচ্ছে... উচ্ছ্বাসহীন, শান্ত... ওর দিকে তাকিয়ে শান্তনুর আজ ওকে প্রস্তুত বলেই মনে হলো। শান্তনু ওর দিকে ফিরে ওর কোমরটা জড়িয়ে কাছে টেনে নিল। তারপর ওর ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। অন্ধকার আকাশে তখন রাতের তারা টিমটিম করছে। সমুদ্রের গর্জন শোনা যাচ্ছে একটানা! আর এই নির্জনতা! শান্তনুর মনে হলো এই মুহূর্তে পৃথিবীতে কিচ্ছু নেই! কেউ নেই! আছে শুধু সে আর কান্তা! আর এই আদি অকৃত্রিম প্রকৃতি! কান্তা চোখ বন্ধ করে মগ্ন হয়ে আছে। শুরুটা শান্তনু করলেও এখন কান্তাই শান্তনুর ঠোঁট চুষে, কামড়ে, ওর জিভ নিজের মুখে নিয়ে ওকে আদর করছে। শান্তনু চোখ বন্ধ করে থাকলেও ভেতরে ভেতরে ভীষণ অবাক হচ্ছে। কান্তা গত তিনদিন যেভাবে ভয় পেয়েছে তাতে ও নিজে এগিয়ে এসে শান্তনুকে আদর করবে এটা প্রায় অবিশ্বাস্য। শান্তনু মনে মনে ভাবল, তবে বুঝি কান্তার নিজেকে গুছিয়ে নিতে একটু সময় লাগছিল। এইবার বুঝি মেঘ কাটল। শান্তনু ওই অবস্থাতেই কান্তাকে আরো নিবিড় করে জড়িয়ে ধরল। তারপর ওকে মাটি থেকে খানিকটা তুলে নিয়ে বুকে চেপে ঘরে ঢুকে এলো। কান্তা কিন্তু একবারও থামেনি। ও একভাবে শান্তনুর দুগাল হাতের মধ্যে নিয়ে শান্তনুকে দীর্ঘ চুম্বন করছে। শান্তনু ঘরে ঢুকে ওকে বিছানায় শুইয়ে দিল। নিজেও ওর ওপর শুয়ে পড়ে ওর গলায় মুখ ডুবিয়ে দিল। ওর কাঁধে, হাতে শান্তনু হাত বোলাচ্ছে। গলায় জিভ বোলাচ্ছে। আস্তে আস্তে শান্তনু মুখ নামিয়ে আনল ওর বুকের ওপর। বুকের মাঝখানে ওর রাত পোশাকের ওপর দিয়ে শান্তনু মুখ ঘষছে। হঠাৎ কান্তার শরীরটা শক্ত হয়ে উঠল। কান্তা কাঁপছে। শান্তনু ওর বুকের থেকে মুখ তুলে দেখল আগের তিনদিনের মতোই কান্তা শূন্য দৃষ্টিতে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে কাতর ভাবে কাকে যেন অনুনয় বিনয় করছে। ওর হাতদুটো দুপাশে এমন করে ছড়ানো যেন মনে হচ্ছে কেউ ওর দুহাত চেপে রেখেছে। ও হাতদুটো নাড়াতে পারছে না। শান্তনু এক ঝটকায় উঠে পড়ল। কান্তা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই স্বাভাবিক ভাবে উঠে বসল বিছানায়। শান্তনু আর বিলম্ব না করে বলেই ফেলল, কী হয়েছে কান্তা? তুমি ভয় পাচ্ছ কেন? আমি তো!
কান্তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে একেবারে। ও মাথাটা নিচু করে নিল।
শান্তনু এবার ওর দিকে এগিয়ে গেল। ওর কাছে মাটিতে হাঁটুর ওপর বসে ওর দু কাঁধে হাত রেখে আবারও জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে কান্তা? আমাকে বলো। তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন! এ তো খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার!
কান্তা গলা নামিয়ে ধীরে ধীরে বলল, ভয় পাচ্ছি কোথায়!
ভয় পাচ্ছ তো! মারাত্মক ভয় পাচ্ছ। কাঁপছ ঠকঠক করে। তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে আমি তোমাকে জোর করছি।
কান্তা একটু ইতস্তত করে বলল, না, তেমন কিছু নয় তো!
তাহলে! তুমি এমন করছ কেন! আমার নিজেকে রেপিস্ট মনে হচ্ছে।
কান্তা এবার সটান তাকাল শান্তনুর দিকে। ওর চোখ দুটো এই আধো আলোয় চকচক করে উঠল। ও তাড়াতাড়ি বলে উঠল, তুমি সরে গেলে কেন!
সরে গেলাম কেন মানে! তুমি এত ভয় পাচ্ছ যে...
কান্তা আবার মাথাটা নিচু করে নিয়ে বলল, তুমি গত তিনদিন এভাবেই সরে গেলে।
হ্যাঁ গেলাম তো। কারণ তুমি যা করছিলে তাতে... শান্তনু এবার এসে বসল ওর পাশে। ওর হাতে একটা হাত রেখে বলল, আমাদের দেশের মেয়েরা কোথাও সেফ নয়। রাস্তাঘাটে, স্কুল- কলেজে, বাসে ট্রেনে এমনকি বাড়িতেও। বেশিরভাগ মেয়েদেরই ছোটোবেলায় কোনো না কোনো দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়। সেটা পরবর্তীকালে ট্রমা হয়ে যায় অনেক সময়। এতে ওই মেয়েটির কোনো অপরাধ নেই। কোনো ভুল নেই। ভালোবাসা পেলে হয়তো আবার সব ঠিক হয়ে যেতে পারে। তুমি আমাকে বলতে পার কান্তা! কী হয়েছিল তোমার সঙ্গে? ভয়ংকর কিছু? এখনো সেটার স্মৃতি ফিরে ফিরে আসে?
কান্তা এতক্ষণ শান্তনুর কথা মন দিয়ে শুনছিল। এবার সে খানিকটা হড়বড় করে বলে উঠল, না না এমন কিছু নয়। এরকম কিছু হয়নি কখনো আমার সঙ্গে।
শান্তনু অবাক হয়ে বলল, তাহলে! তুমি এইরকম করছ কেন!
কান্তা এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল, কীরকম করছি! যেমন স্পনটেনিয়াস রিঅ্যাকশন হবে তাই তো করব।
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। কিন্তু তোমার ভালো লাগছে না! আনন্দ হচ্ছে না। কষ্ট হচ্ছে?
আনন্দ হচ্ছে তো। কান্তা খানিক জোর দিয়েই বলল।
শান্তনু আর কথা বাড়াল না। ওর দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঘরের অন্য প্রান্তে রাখা সোফাটায় বসল। তারপর একটা সিগারেট ধরাল। ওর কাছে পুরো ব্যাপারটা ভীষণ অস্বাভাবিক লাগছে। কান্তা কি কিছু লুকোচ্ছে! ওর কি কোনো অসুখ... এপিলেপ্সি... ভাবনাটা আসতেই শান্তনু মাথাটা আলতো ঝাঁকিয়ে নিল। তাহলে কি একবারও ওর বাবা মা বলত না! এই একটি ব্যাপারে ছাড়া ওর আর কোনো আচরণেই কোনোরকম সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়েনি শান্তনুর। শান্তনুর কাছে পুরোটা যেন ধোঁয়াশার মতো লাগছে।
কান্তা আস্তে আস্তে এগিয়ে এলো শান্তনুর কাছে। ওর কাঁধে হাত রেখে বলল, আমি ভয় পাইনি। আর ভয় পাব না। চলো। ওর চোখে এখন নরম আবদার ফুটে উঠেছে। শান্তনু ওর দিকে তাকাল। কিন্তু শান্তনু আর ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাচ্ছে না। ওর আর ইচ্ছে করছে না। বিরক্ত লাগছে। মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। ও গম্ভীর হয়ে বলল, টায়ার্ড লাগছে। শুয়ে পড়ো।
কান্তা সঙ্গে সঙ্গে ওর কাঁধ থেকে হাতটা সরিয়ে নিল। ওর মুখটা যেন ছোটো হয়ে গেল।
শান্তনুর ওর দিকে তাকিয়ে বিষয়টা আরো গুলিয়ে গেল। কান্তা তো চাইছে। অথচ কাছে গেলে ওরকম করছে কেন!
ওরা দুজন দুপাশ ফিরে শুয়েছিল। দুজনেই বুঝতে পারছে কেউই ঘুমোয়নি। তবু ওরা আর কথা বলছিল না। শান্তনু ভাবছিল, কোনো মানসিক সমস্যার কারণে কি এমনটা হতে পারে! ওর এক বন্ধু সাইকায়াট্রিস্ট। তার সঙ্গে কি একবার তাহলে কনসাল্ট করবে শান্তনু! কিন্তু এতো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলাটাই অস্বস্তিকর। সে যত বন্ধুই হোক না কেন!
হঠাৎই শান্তনু দেখল কান্তা বিছানার ওপর উঠে বসে ওর দিকে ফিরল। তারপর তাড়াহুড়ো করে বলল, আমি যা-ই করিনা কেন তুমি দূরে চলে যাচ্ছ কেন! তুমি কাছে থাকছ না কেন!
এমন বাচ্চাদের মতো কান্তা কথাটা বলল যে শান্তনুর হাসি পেয়ে গেল। আমি কাছে থাকলে তোমার ভালো লাগে?
কান্তা মাথা নাড়াল। তুমি আমার দিকে দেখো না। তোমার যা করার...বলে কান্তা চুপ করে গেল।
শান্তনু আধশোয়া হয়ে মজা করে বলল, আমার কী করার...
কান্তা শান্তনুর কানের কাছে মুখটা এনে ফিসফিস করে টেনে টেনে বলল, আদর।
শান্তনু হাত বাড়িয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তারপর বলল, অনেক রাত হয়ে গেছে। ঘুমিয়ে পড়ো।
কান্তা তাকিয়ে আছে শান্তনুর দিকে...
আচ্ছা আমার কাছে এসো। আমাকে জড়িয়ে ঘুমোও।
ওরা কলকাতায় ফিরে এলো। এর মধ্যে আর শান্তনু একবারও এগোয়নি। কান্তাও আর কোনো কথা বলেনি এ বিষয়ে। ওদের দৈনন্দিন জীবন যাপন সহজ হয়েছে। নতুনের আবরণ সরিয়ে রাখছে দুজনেই। একসঙ্গে ইউনিভার্সিটি এবং অফিস যাতায়াত করছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছে। স্কুটিতে চড়ে বাজার করতে যাচ্ছে। কিন্তু কোথায় যেন একটা দূরত্ব রয়ে যাচ্ছে দুজনের মধ্যে। একটা ফাঁক! সেটা আর কেউ না বুঝলেও শান্তনু আর কান্তা দুজনেই টের পাচ্ছে। তবু শান্তনু সময় নিচ্ছে। কান্তা ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই বিয়েটা হয়ে গেছিল ওদের। শান্তনুকে ওর জীবনে জায়গা দিতে একটু সময় লাগতেই পারে। এই কয়েক মাসে শান্তনু ভালোই বুঝেছে যে বয়স অনুযায়ী কান্তা একেবারেই ম্যাচিওর নয়। ছেলেমানুষি রয়েছে ওর বেশ কিছু ক্ষেত্রে! হয়তো তেমন কোনো ছোটোখাটো কারণেই ও ওইভাবে রিএক্ট করেছিল। শান্তনুকে ভালোবাসতে পারলে হয়তো এই ছেলেমানুষি কেটে যাবে। শান্তনু খেয়াল করেছে যে এর মধ্যে দুবার গভীর রাতে শান্তনু ঘুমিয়ে পড়েছে ভেবে কান্তা শান্তনুর পিঠে আলতো করে হাত রেখেছে। শান্তনুর ঘুম ভেঙে গেছে। তবু ও সাড়া দেয়নি। একটা চাওয়া যখন বারবার কোনো এক অজানা কারণে থমকাতে বাধ্য হয় তখন সেখান থেকে কিছুদিন অন্তত নিজেকে উইথড্র করে নিতে হয়। শান্তনু অন্তত এ কথায় বিশ্বাস করে। যা তার তা তার কাছে ফিরে আসবেই। আসতেই হবে। কান্তা যে ভেতরে ভেতরে ছটফট করছে শান্তনু টের পেয়েছে। তবু নিজেকে একটা দূরত্বে সরিয়ে রেখেছে ও।
হঠাৎই অফিস থেকে ট্যুরে পাঠাল শান্তনুকে। ব্যাঙ্গালোর। এক সপ্তাহের জন্য বেরিয়ে গেল শান্তনু। বেরোবার সময় কান্তার চোখে জল দেখেছে ও। শান্তনুর নিজেরও মন খারাপ হয়েছে। কান্তাকে ছেড়ে যেতে মন চায়নি। কিন্তু কখনো কখনো কোনো কোনো সম্পর্কে গভীরভাবে একে অপরকে কাছে পাওয়ার জন্য সাময়িক দূরত্বের প্রয়োজন পড়ে। সেটুকু পার করতেই হয়।
শান্তনু যেদিন ফিরে এলো কান্তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল। মেয়েটার চোখে বিষাদ ছায়া ফেলেছে। কেমন যেন আকুল অথচ তটস্থ হয়ে রয়েছে ও। শান্তনুকে খেয়াল করছে। কিন্তু কাছে আসছে না। আড়াল খুঁজছে না কাছে পাওয়ার জন্য! শান্তনু সবই বুঝতে পারছে। তবু একটা নিস্পৃহভাব নিজের আচরণের মধ্যে বজায় রেখেছে। এমনকি টায়ার্ড বলে তাড়াতাড়ি ডিনার সেরে শুয়েও পড়ল। কিন্তু ঘুম আসছে না কিছুতেই। শরীর অবশ লাগছে। মন খারাপ করছে তারও। কান্তাকে আজ তার ভীষণ কাছে পেতে ইচ্ছে করছে। ভেতরে ভেতরে খানিকটা অধৈর্য হয়ে পড়েছে সে-ও।
অনেক রাতে কান্তা পাশে এসে শুলো। শান্তনু নড়ল না। যেমন শুয়েছিল তেমনই শুয়ে থাকল। খানিকটা পর ও অনুভব করল কান্তা এগিয়ে এসে ওর পিঠের কাছে গুটিসুটি মেরে শুয়ে কাঁদছে অঝোরে। শান্তনু তাড়াতাড়ি পাশ ফিরে ওকে জড়িয়ে নিল বুকের মধ্যে। কান্তা নিজেকে সম্পূর্ণ ছেড়ে দিল শান্তনুর হাতে। আর কোনো সংকোচ, লজ্জা কিচ্ছু নেই যেন কান্তার। শান্তনু যেভাবে ওকে এতো মাস ধরে চেয়েছে সেভাবেই ও ধরা দিল। শান্তনুও আর সামলাতে পারল না নিজেকে। পাগলের মতো আদরে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিল কান্তাকে। এতোদিনের সমস্ত অভিমান, দূরত্ব মুহূর্তের মধ্যে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
তারপর কেটে গেছে আরো কয়েক মাস। সেদিন সকালের খবরের কাগজে বড়ো বড়ো করে খবর বেরলো দিল্লিতে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর ঘটনাটির। রাতের বাসে বীভৎসভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে একটি মেয়েকে। তার প্রেমিকও আহত মারাত্মকভাবে। মুহূর্তের মধ্যে দেশজুড়ে শোরগোল পড়ে গেল। বাড়িতে, বাজারে, অফিসে সর্বত্র এই একই আলোচনা।
রবিবারের সকাল। শান্তনু বাজার করে ফিরে ডাইনিং হলে বসে এই ঘটনার আপডেট নিয়েই নানা কথা বলছিল বাবা ও বোনের সঙ্গে। মা রান্নাঘরে। কান্তা বোধহয় ঘরে। সামনে দেখতে পাচ্ছে না ওকে। কথা বলতে বলতেই কি একটা দরকারে নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতেই ওর নজর পড়ল বাইরে কলতলার পাঁচিলটার দিকে। কান্তা ওই পাঁচিলে হেলান দিয়ে কী করছে! দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে অবশের মতো দাঁড়িয়ে আছে কেন? শান্তনু এগিয়ে গিয়ে ভালো করে খেয়াল করল কান্তাকে। তারপর চমকে উঠল। কান্তা ওভাবে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে প্রবলভাবে মাথা নাড়ছে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে ওর শরীরের ওপর ভয়ংকর কোনো অত্যাচার চলছে। আর ও সেটা প্রতিহত করতে পারছে না।
শান্তনু প্রায় ছুটে বেরিয়ে এলো কলতলায়। ওর চটির আওয়াজ পেয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে কান্তা। শান্তনু ওর কাছে এসে বলল, কী হয়েছে তোমার? কী করছিলে এখানে একা একা?
কান্তার মুখটা শুকিয়ে গেছে। কোনো উত্তর দিচ্ছে না ও।
শান্তনু ওর কাঁধ ধরে আলতো করে ঝাঁকিয়ে আবারও জিজ্ঞেস করল, বলো বলো কী হয়েছে? এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে তুমি কী করছিলে?
কান্তা কোনোরকমে উত্তর দেয়, কিছু না।
সত্যি কথা বলো কান্তা! তোমার কোনো অসুখ আছে? কোনো ট্রমা? এর আগেও আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করে উত্তর পাইনি। আজ বলতেই হবে।
কান্তা তখনো চুপ করে আছে দেখে শান্তনু বলল, ঠিক আছে। আমি তবে এই বিষয়টা নিয়ে বড়দের সঙ্গে কথা বলি! সেটা ভালো হবে?
কান্তা এবার শান্তনুর হাতটা জোরে চেপে ধরে বলল, দোহাই তোমার। আর কাউকে বোলো না প্লিজ। আমি বলছি তোমাকে।
শান্তনু ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
কান্তা একটু সময় নিয়ে বলল, আমার এরকম করতে ভালো লাগে।
কীরকম?
এই যে... কেউ জোর করছে... আর আমি কষ্ট পাচ্ছি...
মানে? শান্তনু যারপরনাই অবাক হয়েছে একথা শুনে।
কান্তা শান্তনুর দিকে তাকিয়ে একটু থেমে আবার বলল, মনে হয় কেউ জোর করুক। আমাকে যন্ত্রণা দিক। ছাড়বে না কিছুতেই আমাকে!
এসব তুমি কী বলছ কান্তা? এসবের মানে কী!
মানে ওই মেয়েটার মতো হোক!
শান্তনু আর মাথার ঠিক রাখতে পারল না। চেঁচিয়ে বলে উঠল, তুমি চাও যে তোমার রেপ হোক! তুমি কি পাগল!
কান্তা খানিকটা দিশেহারা হয়ে বলল, সত্যি না কি! মিছিমিছি...
শান্তনুর অবাক হওয়ার যেন শেষ নেই আজ! ওর দিকে তাকিয়ে শান্তনু হাঁ হয়ে গেল। একটা মেয়ে চায় তার মিথ্যে মিথ্যে রেপ হোক! এ তো বিকৃতি! পারভারশান। সেইজন্য ও কাছে গেলেই ওইরকম করত। ভয় পেত... এগুলো ওর ভাণ! শান্তনু আর দাঁড়াল না ওর কাছে। ঘরে ঢুকে এলো। অদ্ভুত একটা বিরক্তিতে ওর সারা শরীর ছেয়ে আছে! ও ভাবতেই পারছেনা কান্তার মতো একটা মেয়ে, যাকে ওপর থেকে স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছিল, তার ভেতরে এতো বিকৃতি! এই নোংরামো! আর শান্তনু কি না এই মেয়েটাকেই এতো ভালোবেসেছে! শান্তনুর ঘেন্না করছিল! ঘেন্না করছিল নিজের শরীরটাকে! ঘেন্না হচ্ছিল কান্তাকে!
এই ঘটনার পর থেকে শান্তনু কান্তার সঙ্গে কথাবার্তা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। কান্তা কথা বলতে চেয়েছে। কান্তা কান্নাকাটি করেছে। শান্তনু কোনোভাবেই ওকে প্রশ্রয় দেয়নি! ওর ডাকে সাড়া দেয়নি। ওকে ছোঁয়নি। কান্তা শান্তনুর সামান্য স্পর্শ পাওয়ার জন্য ছটফট করেছে... বারবার শান্তনুকে জানিয়েছে সে কথা! শান্তনু মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে ঘৃণায়। ডিভোর্সের কথাও ওর মনে এসেছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু তাদের বাড়ির একটা সম্মান আছে! সেটা ধুলোয় মিশে যাবে একেবারে! বোনের এখনো বিয়ে হয়নি! কিন্তু কান্তার সঙ্গে এক ঘর, এক বিছানা ভাগ করে নেওয়াও তার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না! এসব ভেবে শান্তনুর বিরক্তি আরো বেড়েছে। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি সে।
এর মধ্যে শান্তনুর অফিসেও একটা ঘটনা ঘটে গেল। শান্তনুর আন্ডারে কাজ করে একটি ছেলে, ওর নাম পলাশ। হঠাৎ একদিন জানা গেল পলাশ আত্মহত্যা করেছে। খবরটা শুনে শান্তনু খুবই কষ্ট পেল। পলাশ তার জুনিয়র। ছেলেটি খুবই উজ্জ্বল। ভীষণ সিনসিয়ার ও এফিশিয়েন্ট। এমন একটা ছেলের মনে কী এমন কষ্ট ছিল যে তাকে এভাবে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হলো! শান্তনুর ওপরের রাঙ্কের অর্চিষ্মানদার সঙ্গে কথা হচ্ছিল এই নিয়ে।
কী হয়েছিল অর্চিদা? পলাশ এভাবে..
তুই জানিস না!
কী জানব?
পলাশ কেন এমনটা করল! ও তো চিঠি লিখে গেছে।
হ্যাঁ, পুলিশ একটা চিঠি পেয়েছে শুনেছি। কিন্তু কী লেখা আছে সে চিঠিতে সেসব জানি না।
অর্চিষ্মান গম্ভীর হয়ে তাকাল শান্তনুর দিকে।
শান্তনু বলল, না মানে, জানতেই হবে এমন কোনো কথা নেই! পলাশের ব্যক্তিগত ব্যাপারে এত কৌতূহল ভালো নয় অবশ্যই। তবু ছেলেটা এভাবে চলে গেল!
অর্চিষ্মান বলে উঠল, পলাশ গে ছিল। ওর পার্টনার ছিল। বাড়িতে সেটা জানাজানি হয়ে যায়। তাই...
কী বলছ! গে! পলাশ! সে কী!
এত অবাক হচ্ছিস কেন শান্তনু! গে হওয়াটা কি অপরাধ!
শান্তনু একটু থতমত খেয়ে বলল, না অপরাধ কেন হবে! তবে এইসব বিকৃতি...
অর্চিষ্মান শান্তনুর কথাটা শেষ করতে দিল না। উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, বিকৃতি! কেন? বিকৃতি কেন! তোর মতো নয় বলে! আর পাঁচজনের মতো নয় বলে! তাই তাকে বিকৃত বলে কোণঠাসা করে দিবি তোরা!
না, না অর্চিদা, তা ঠিক নয়। আমি বলতে চাইছি, এটা তো স্বাভাবিক নয়...
কোনটা স্বাভাবিক সেটা ঠিক করে দেওয়ার তুই কে! বেশিরভাগ মানুষ একরকম বলে সেটাই স্বাভাবিক ধরে নিয়ে বাকি সব কিছুকে অস্বাভাবিক, বিকৃত বলার তুই কে! তোরা কে!
শান্তনু বুঝতে পারছে অর্চিষ্মান প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে গেছে। সেটা কি শুধুই পলাশের জন্য! না কি... অর্চিষ্মানের এই আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না শান্তনু। সে একটু চুপ করে থেকে বলল, তুমি এত রিএক্ট করছ কেন!
রিএক্ট করব না! দুনিয়াটা কোথা থেকে কোথায় এগিয়ে গেছে তোরা জানিস! কোনো খোঁজখবর রাখিস! তুই বড়োজোর দুটো শব্দ জেনেছিস, গে আর লেসবিয়ান! তার বেশি তুই কিছু জানিস! কুইয়ার, কিঙ্ক, বিডিএসএম, এলজিবিটিকিউআর, প্যানসেক্সুয়াল, এসেক্সুয়াল,পলিঅ্যামোরাস এসব সম্পর্কে তোর কোনো ধারণা আছে? তুই জানিস এদের সম্পর্কে কোনো কথা! যে এককথায় এদের অ্যাবনর্মাল, পারভার্টেড বলে দিলি!
শান্তনু সত্যি এসব সম্পর্কে জানে না। কখনো ভাবেনি এসব নিয়ে! দু একটা শব্দ কখনো যে কানে আসেনি এমন নয়, কিন্তু ওইটুকুই! ওর বেশি আগ্রহ তৈরি হয়নি কখনো!
অর্চিষ্মান একটু থেমে বলল, তুই বা তোরা লাকি! যাদের নিজেদের জেন্ডার ও সেক্সুয়ালিটির মধ্যে কোনো পার্থক্য ভাবতে বাধ্য হতে হয়নি। যাদের সেই রাস্তাটা দিয়ে হাঁটতে হয়, যারা নিজেদের জেন্ডার পরিচয় নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে পারে না, তাদের যন্ত্রণা তোরা কোনোদিন বুঝবি না! শুধু তাদের নিয়ে মজা করবি, হেয় করবি তাদের!
শান্তনু বুঝতে পারল অর্চিদা বিষয়টা খুবই পার্সোনালি নিয়েছে। একটা সন্দেহ শান্তনুর মাথায় উঁকি দিয়ে গেল। ও অবশ্য জানে অর্চিদার বৌ আছে, ছেলে আছে। কিন্তু তাও অর্চিদা এই ব্যাপারটা নিয়ে এতো সেন্সেটিভ কেন!
অর্চিষ্মান একগ্লাস জল ঢকঢক করে খেয়ে ফেলল। তারপর খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, পারলে এসব নিয়ে একটু জানাবোঝার চেষ্টা কর। বাইরের দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখ... ওরা কতটা এগিয়ে গেছে এসব নিয়ে.. আর তোরা কোথায় পড়ে আছিস। শান্তনু আর কথা বাড়াল না। ওর চোখের সামনে কান্তার মুখটা ভাসছে। কান্তাকেও তো সে বিকৃত বলেই মনে করেছে। তবে কি এর মধ্যেও অন্য কোনো কথা আছে!
শান্তনু উঠে এলো অর্চিষ্মানের সামনে থেকে। নিজের কেবিনে বসে ল্যাপটপে ও সেক্সুয়ালিটি বিষয়ে নানা কিছু পড়তে শুরু করল। ওর সামনে ধীরে ধীরে একটা অন্য জগত যেন খুলে যেতে লাগল।
এরপর থেকে শান্তনু যখনই সময় পায় এসব নিয়ে পড়াশোনা করে। ইন্টারনেটে এসব নিয়ে বিস্তৃত লেখালেখি আছে। ছেলে ও মেয়েদের বিভিন্ন যৌন চাহিদা নিয়ে পড়তে পড়তে শান্তনু আবিষ্কার করল ধর্ষণের চাহিদার কথা। কিঙ্ক প্র্যাকটিশানাররা এটা করে থাকে। যদিও তা কনসেন্ট নিয়ে করা হয়। এবং তার আফটার কেয়ার এক্ষেত্রে একটা বড়ো ভূমিকা রাখে। নারীবাদীদের সঙ্গে এদের বিরোধের কথাও এই লেখাগুলোর মধ্যে আছে। শান্তনু পড়তে পড়তে অবাক হয়ে গেল। কান্তা কি এতো কিছু জানে! বোধহয় না। ও বোধহয় ওর বেসিক ইনস্টিংট থেকেই এটা ফিল করেছে। সবটা জানলে ও হয়তো এই বিয়েতে রাজিই হতো না।
এই মুহূর্তে কান্তাকে খুব অসহায় বলে মনে হচ্ছে শান্তনুর। তাদের যৌথজীবনে কান্তা তার মানে কোনোদিনই সুখি হতে পারেনি। কিন্তু শান্তনুর সুখের পথে ও কোনোদিন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আর নিজের অতৃপ্তি একা একা সামলাতে চেষ্টা করেছে। পারেনি। ধরা পড়ে গেছে শান্তনুর কাছে। অপমানিত হয়েছে। শান্তনুর মনে হলো এখনই সে ছুটে বাড়ি গিয়ে কান্তাকে জড়িয়ে ধরে! তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয়। সঙ্গে সঙ্গে আবার ভাবল, কিন্তু কান্তাকে এভাবে যৌনসুখ দেওয়া কি সম্ভব হবে শান্তনুর পক্ষে! নিজেকে রেপিস্ট বলে ভাবতে, অন্তত ওভাবে অ্যাক্ট করা শান্তনুর পক্ষে কোনোদিন সম্ভব নয়। আর তাছাড়া তার সুখানুভূতির সঙ্গে তো এর যোজন পার্থক্য! কান্তাকে সে যেমন তার জন্য বদলাতে বলতে পারেনা, তেমনই নিজেকে কান্তার জন্য বদলালে সেটাও তো একভাবে কান্তাকে ঠকানোই হবে। সেই সঙ্গে নিজেকেও ঠকাবে সে, বঞ্চিত করবে নিজেকে! শান্তনু বুঝল তার আর কান্তার পথটা আলাদা ছিল আসলে! কোনোদিনই সে পথ মিলবে না। আমাদের মতো গোঁড়া দেশে বিয়ের আগে দুজন অ্যাডাল্টের সেক্স নিয়ে কথা বলার কোনো সুযোগ দেওয়া হয় না। হলে এমন অনেক অসফল বিয়ে বোধহয় এড়ানো যেত।
শান্তনু একটা সিগারেট ধরাল। দীর্ঘ একটা টান দিতে দিতে সে কেবিন থেকে অনেক নিচের শহরটাকে দেখছে! শহরটা কতদূর ছড়িয়ে গেছে! আর মানুষগুলো কেমন ছোটো ছোটো! সিগারেটে আরো একটা লম্বা টান দিয়ে শান্তনু কান্তার নাম্বারটা ডায়াল করল।